টিউটোরিয়ালবিডি (একুশে ফেব্রুয়ারী ২০০৯ থেকে জুন ২০১২)

পড়ালেখার সময়টা শিক্ষার চেয়ে অনেক বেশি অপচয় হচ্ছে বলে মনে হওয়ায় আমাকে চাকরীর পথটা বেছে নিতে হয়েছে। তাই অনার্সের চতুর্থ বছরের সম্পূর্ণটাই আমি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরী করে কাটাই। আর গুরুত্বপূর্ণ কোন ক্লাস হলে অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে ক্লাসে চলে যেতাম। শেষের দিকে  অনিয়মিত ক্লাসে থাকায় ক্লাসে না গিয়ে কিভাবে পড়ালেখা করা যায় এ ব্যপারে নতুন কোন পথ খুঁজে বেড়াতাম।

ফাইনাল পরীক্ষার দু'মাস আগে চাকরীটা ছেড়ে দিলাম। আর পড়ালেখায় মন দিলাম। সব শেষে ফাইনাল পরীক্ষা হলো এবং শেষ পরীক্ষার দিন নিজেকে অনেক স্বাধীন মনে হলো। বাংলাদেশের  বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে মেয়ের কাছেই অনার্সের শেষ দিনটি অনেক আনন্দের আর খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে খোলা আকাশে ওড়ে যাওয়ার মতোই স্বস্তির। চার বছরের কোর্সগুলো তিন বছর পার না হতেই  ছেলেদের চাকরীর আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের কথা ভাবতে থাকে বাবা মা। আর এটা ছয় সাত বছরে গড়ালে ছেলে মেয়েদের মাথায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়বদ্ধতা চলে আসে।

ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলেও প্রোজেক্টগুলো বাকি আছে। কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে এক এক জন এক একটি বিষয়ে প্রোজেক্ট করার পরিকল্পনা করলো। আইপিভি ৬, ইআরপি আরো কয়েকটি প্রোজেক্ট ছিল। আমার প্রোজেক্টটি ছিল "ই-লার্নিং" বিষয়ের উপরে। সবচেয়ে ননটেকি একটি বিষয় মনে হলো আমার কাছে। তার পরও এই প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ করা খুবই সহজ হবে বলে মনে হলো।

অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উপরে বিদেশীদের কাজ আর পরিকল্পনাগুলোর কী-ওয়ার্ড ওয়েবে সার্চ দিয়ে যা পাওয়া গেল তা দিয়ে স্যার কিছু একটা বানিয়ে নিতে বললেন। তিনি নিজেও কিছু সংগ্রহ করে দিলেন। সব তথ্য কপি পেস্ট করে আর কিছু নিজেরা তাড়াহুড়া করে সংগ্রহ করে মোটামুটি কয়েকশো পৃষ্ঠার একটি বই হয়ে গেল। যেহেতু প্রোজেক্ট হার্ডকপি বানিয়ে ফেলেছি এবং একটা পিএইচপি দিয়ে ওয়েব ইন্টারফেসের কাজটা হয়ে গেছে এখন এটার উপরে স্টাডি করতে হবে। মোট কথা কপি পেস্ট বিষয়গুলো মুখস্ত করা। কারন ভাইভা বোর্ডে এই বইটি থেকেই প্রশ্ন করবে।

বইটি পড়তে গিয়ে বেশ কিছু ওপেন সোর্স কনটেন্ট ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেমের নাম এসে গেল। এর মধ্যে দুইটির নাম মনে আছে- "এ- টিউটর" আর "মোডল"। এর আগে অফিসে বসে বাংলা  সামহোয়্যার ইন ব্লগ আর প্রথম আলো ব্লগ পড়ার সময় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ওয়ার্ডপ্রেস , জুমলা , পানবিবি ও পিএইচপিবিবির নাম শুনেছি। এই সিএমএস দিয়ে নিজের একটি শিক্ষামূলক প্রোজেক্ট বানানোর প্লান হয়ে গেল।

২০০৯ এর ২০ ফেব্রুয়ারীতে  প্রথম আলো-ব্লগ বাংলাদেশের অনলাইন কমিউনিটির প্রথম পিকনিক হয়। আমি সেই পিকনিকে উপস্থিত ছিলাম। তার পরের দিন একুশে ফেব্রুয়ারী ২০০৯ টিউটোরিয়ালবিডি নামের ডোমেইনের জন্ম হয়।  প্রথমে একটি ফ্রিহোস্টে এবং পড়ে নিজের একটি হোস্টিং এ মোডল ইঞ্জিন সেটআপ করলাম। মোডল ইঞ্জিনটিই আমার প্রথম সিএমএস যা নিয়ে কাজ করি। এটিতে কোর্স, প্রশিক্ষক, শিক্ষার্থী, এডমিন ইত্যাদি একাউন্ট খোলা যায়। আর এটাতে কোর্স কনটেন্ট, ব্লগ, ফোরাম, চ্যাট ইত্যাদি বিষয় বিল্ডইন অবস্থায় আছে। মোডল ইঞ্জিনটি আমার চাহিদা পূরণ করতে পারবে কিনা তা যাচাই বাছাই করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে গেলো। এটি অনেক ভারি একটি সাইট হওয়ায় এবং বাংলা অনুবাদ খুবই কঠিন হবে দেখে এটি সার্ভার থেকে মুছে দিলাম। এর পর এ-টিউটর  দিয়ে একটি শিক্ষামূলক সাইট বানানোর জন্য এটির প্রায় ৬০% অনুবাদ নিজে নিজে করে ফেললাম।  বেশকিছু সদস্য রেজিস্ট্রেশন করলো। কিছু কনটেন্টও যোগ করলাম।

কিন্তু সমস্যা হলো এই ধরনের ক্লোজড প্লাটফর্মে বাংলাদেশের মানুষকে অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় তখনও হয়ে ওঠে নি। এই ই-লানিং স্ক্রিপ্টগুলো এমন ভাবে তৈরী যে কোন একজন ইউজার শুধুমাত্র তার ভর্তিকৃত বিষয়ের কনটেন্ট দেখতে পাবে এবং তার বিষয়ের শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। এখন নিজেকেই বদলাতে হলো। ওপেন প্লাটফর্মের জন্য প্রথমেই ওয়ার্ডপ্রেসকে বেছে নিতে হলো। আর এলিজেন্টের একটি থিম ডাউনলোড করে প্রথম Tutorialbd.com/bn ফোল্ডারে ওয়ার্ডপ্রেস ৩.১ ইস্টল দেই। প্রথম থেকেই প্লান ছিল ভবিষ্যতে মূল ওয়েবসাইটটি ওয়ার্ডপ্রেস হবে না। বর্তমানের টিউটোরিয়ালবিডি ব্লগটি আমার কাছে এখনো একটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ। একজন শিক্ষার্থীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা শুধু এই ব্লগ দিয়ে সম্ভব না।

অধিকাংশ প্রোজেক্ট মালিকই তাদের প্রোজেক্টের ব্যপারে প্রথমে আবেগ প্রবণ থাকে  এবং এক সময় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। আর বাস্তবতার মুখে এসে আমাকে অনেক কাজ করতে হয়েছে।

চার বছর আগে যাদের সাথে লেখালেখি করতাম সহব্লগাররা কেউই আর এখন লিখেন না। বরং তাদের পরে এসেই অনেকে প্রতিষ্ঠিত আয়ের পথে গিয়ে ব্লগ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। আমি হইনি এখনো।  যা পারি না সেই বিষয়েও আমাকে কনটেন্ট তৈরী করতে হয়েছে। কোন কোন বিষয় শিখতে হয়েছে শুধু লেখার জন্যই। লিখতে লিখতে একসময় দেখলাম সব লেখাই তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আর তাই ব্লগটাও হয়ে গেল প্রযুক্তি ব্লগ। টানা দেড় বছর কাজ করার পর অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে একটানা কিছু দিন লেখালেখি বন্ধও ছিল। এর পর চাকরীর কারনে আমাকে চট্টগ্রাম চলে যেতে হয় এবং লেখালেখি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ব্লগটির তখন মৃত প্রায় অবস্থা।

আমি ছুটলাম টাকার খোঁজে। বেশ কিছু ওয়েব ডিজাইনের কাজ হাতে পেয়ে দেখলাম ব্লগিং এর চেয়ে এটাতে বেশি টাকা আয় সম্ভব। ব্লগে আমার পরিচিতি বাড়ার কারনে অল্প দিনে অনেক হোস্টিং ক্লাইন্ট হয়ে গেল। আমার পাঠকরা ভাবলো আমার হোস্টিং সেবা ভালই হবে, যেহেতু আমার লেখা তাদের ভাল লাগে 😛 । একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরী করা অবস্থায় এত কিছু পরিচালনা খুবই কষ্টকর হয়ে গেল।

২০১০ এর শেষের দিক থেকে আমি টিউটোরিয়ালবিডি থেকেই ডোমেইন ও ওয়েব হোস্টিং বিক্রি করতে থাকি। একাই সাপোর্ট দেওয়া শুরু করি।  লোকজন যে কোন সময় আমার সাথে কথা বলতে পারতো এবং বাড়তি কিছু শিখার উদ্দেশ্যই ওয়েব হোস্টিং কিনে নেয়। অনেকে আমার মতো ওয়েব হোস্টিং বিক্রি করতে চাইলো, তাদের জন্য ভিপিএস ও মাস্টার রিসেলার থেকে প্রথম রিসেলারগুলো বিক্রি করতে থাকি। আমার রিসেলারদের ক্ষেত্রে আমি সব সময় দুটি কাজ করতাম যা তাদের দরকার- (১) তারা যে আমার রিসেলার তার তথ্য না জানানো (২) ব্যবসা ভাল করার পদ্ধতিগুলো শিখানো। একসময় অনেক বেশি ক্লাইন্ট হয়ে গেল এবং আমি পরিচলনা করতে হিমসিম খেলাম। টিউটোরিয়ালবিডি থেকে ছয় মাস ওয়েব হোস্টং বিক্রির পরে ক্লাইন্ট সাপোর্ট সিস্টেম এর জন্য নিজস্ব ডোমেইন টিউটোহোস্ট নিলাম। WHMCS ইনস্টল করে ক্লাইন্টদের এড করলাম। টিউটোরিয়ালবিডি এই সময় অনেক অবহেলায় পড়ে ছিল। কারন আমাকে ওয়েব হোস্টিং বিষয়ক অনেক বেশি কিছু শিখতে হয়েছে, সার্ভার পরিচালনা, সাপোর্ট দেওয়া এবং চাকরীটিও একই সাথে চালিয়ে যেতে হয়েছে।

২০১১'র শেষে মনে হলো- এখন কাজ ভাগ করে দেওয়ার সময় হয়েছে। ২০১২'র প্রথম দিকে অসীম কুমার, নিলুফার ইয়াসমিন,আরিফুল ইসলাম শাওন, হাসান যোবায়েরসহ আরো কয়েকজনের সহযোগিতা চাইলাম যাতে টিউটোরিয়ালবিডিকে আবারও আগের অবস্থায় নিয়ে আসা যায়। তারা আমাকে দারুন ভাবে সহযোগিতা করলেন।  জানুয়ারী ২০১২ এ ওয়েব হোস্টিং এর কাজের অনেক অংশই নিলুফার ইয়াসমিন আপুকে দেওয়া হলো। অসীমভাইকে টিউটোরিয়াল ধারাবাহিক লেখার অনুরোধ করলাম। তিনি এইচটিএমএল টিউটোরিয়াল লেখা শুরু করলেন। মাঝ পথে  Blog.TutoHost.com চালু করেছিলাম যা জনপ্রিয়তা না পাওয়ায় বন্ধ করে দিতে হলো। কয়েক মাস যাওয়ার পর আরো বেশি স্ট্যাটিক টিউটোরিয়াল আর ই-বুক লেখার প্লান মাথায় কাজ করতে লাগলো।  জনপ্রিয় ব্লগার ব্যক্তিত্ব আরিফুল ইসলাম শাওন ভাইকে বললাম ওয়ার্ডপ্রেস টিউটোরিয়াল লিখতে। হাসান জুবায়ের ভাই টিউটোরিয়ালবিডির জন্য নিয়মিত ব্লগিয় ধারা বজায় রাখলেন।

২০১২ এর মাঝামাঝিতে টিউটোরিয়ালবিডি নতুনভাবে ভিজিটর বাড়তে লাগলো। এই সময় ছয়জন লোক টিউটোহোস্ট ও টিউটোরিয়ালবিডির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এইচটিএমএল, সিএসএস, জাভাস্ক্রিপ্ট, ওয়ার্ডপ্রেস, জুমলাসহ বেশ কিছু পূর্ণাঙ্গ টিউটোরিয়াল ও কয়েকটি ই-বুক প্রকাশ হয়ে গেছে।

জুলাই ২০১২ থেকে ফুলটাইম আমি টিউটোরিয়ালবিডিতে সময় দেওয়া শুরু করেছি। টিউটোরিয়ালবিডি সব সময় ভাল মানের কন্টেন্ট উপহার দিতে চায় আর এর মান বৃদ্ধির জন্য আমি ও আমার দল চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আপনারা দোয়া করবেন। দোয়া করবেন, সেই ছাত্র জীবনের  শিক্ষামূলক কাজ করার যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলাম তা যেন বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারি।

2 thoughts on “টিউটোরিয়ালবিডি (একুশে ফেব্রুয়ারী ২০০৯ থেকে জুন ২০১২)”

  1. হাসান যোবায়ের

    এই ব্লগের জন্ম ইতিহাস জেনে ভাল লাগলো। 🙂
    আরো ভাল লাগলো ব্লগিং আপনি এখনো ছাড়েননি তাই।

    আমার কাছে মাঝে মাঝে মনে হয় ৫ বছর পরেও কি ব্লগিং চালিয়ে যেতে পারবো? নাকি প্রফেশনাল কাজের চাপে ব্লগিং বন্ধ হয়ে যাবে? হয়তো সেটা সময়ই বলে দিবে। তবে আমি এখন পর্যন্ত ব্লগিং এনজয় করি। 🙂

  2. আজ এখন পর্যন্ত যতদূর পৌছাতে পেরেছি, মাহাবুব ভাই এর কৃতিত্ব অনেকখানি। সবসময়ই এমন একজনকে খুজতাম যাকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করা যায়। বন্ধুদের সাথে সব সময়ই চেষ্টা করতাম গ্রুপ করে কোন ভাল কিছু করার, আসলে তাদের সাথে মানষিকতার মিন খুজে পায়নি, সময় , বাস্তবতা , সামর্থ একসাথে কখনোই কথা বলেনি। কিন্তু টিউটোরিয়ালবিডিতে শখের বশে লেখা প্রকাশ করার পর পেয়ে গেলাম আমার কাংঙ্খিত মানুষটাকে , যিনি সর্বদাই সকলের জন্য সৎ এবং কাঙ্খিত সমাধান দেয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। তার সাথে অনেকটা সময় পার করে ফেলেছি , যদিও আমাদের কখনো সরাসরি দেখা হয়নি তারপরেও সুখের স্মৃতি, কষ্টের মূহর্ত, ব্যার্থতা, হতাশা, সফলতার পরম মূহর্ত, আসন্ন ভবিষ্যৎ, অগ্রগতি এতবেশি আলোচনা করেছি যা আমার বন্ধুমহলের কারো সাথেই কখনোই করা সম্ভব হয়নি। তার কাছ থেকেই শিখেছি সময়ের চাহিদা কি? সফলতার জন্য সততা , দক্ষতা, উপস্থাপনা,যোগাযোগ আর ধর্য্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। টিউটোহোস্ট পরিবারের একজন সদস্য হওয়াটাকে আমি আমার জীবনের অন্যতম সৌভাগ্য বলে মনে করি।

Leave a Comment