অনলাইন সাংবাদিকতাঃ ব্লগারদের পথ হতে পারে

সংবাদটা যত দ্রুত পৌছানো দরকার ততটা দ্রুত ছিল না একসময়। অন্তত একদিন পরে সংবাদ পত্র দরজার সামনে পৌছাতো। এখন পরিবর্তন এসেছে... জীবন্ত খবর প্রচার হচ্ছে ব্লগে, ফোরামে, ফেসবুক, টুইটারে। এই পরিবর্তনের মাঝেই নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রচেষ্টায় ব্লগাররা এগিয়ে যেতে পারে।

অনলাইন সাংবাদিকতাঃ ব্লগারদের পথ হতে পারে

বাংলাদেশে বেশ কিছু ব্লগারা সাধারনত নিজের জানার ও জানানো ইচ্ছার কারনেই ব্যক্তিগত ব্লগে বিভিন্ন খবর, খবরের ভেতরের খবর আর তার উপরে আলোচনা, সমালোচনা করে থাকেন। আর সংবাদ মাধ্যম যতটা আবেদন সৃষ্টি করে অনেক সময় ব্লগে একটি খবর তার চেয়ে বেশি আলোচনার ঝড়ও সৃষ্টি করে। অনলাইনের তথ্যটিও একটি খবরের শিরোনাম হয় পত্রিকায় পাতায়। আর এই জিনিসটি দিন দিন আরও বেড়ে যাবে... এগিয়ে যাওয়ার পথে আমরা হয়তো ভিন্ন ধারার সাংবাদিকতা দেখতে পাবো।

জুলিয়াস আসাঞ্জের উইকিলিকস অনেক সংবাদ মাধ্যমের খবরের খোরাক হয়েছে। আর নিয়র্ক টাইমস, সিএনএন ইত্যাদির এর নিয়মিত অনলাইন পত্রিকাগুলোর খবরই বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকায় পরের দিন অনুদিত হয়ে ছাপা হচ্ছে। এখন সাংবাদিকতা অনেক বেশি অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছে। এক সময় হয়তো সম্পূর্ণ পদ্ধতিটিই পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন ধরনের সংবাদ মাধ্যমের মুখ আমরা দেখবো।

বাংলাদেশের অনলাইন পত্রিকার পাথেয় বিডিনিউজ২৪ এবং এর পরে অনেক পত্রিকা-ই  তাদের অনলাইন সংস্করণ বের করেছে। বেশ কিছু অনলাইন পত্রিকার উদ্যোগও নিয়েছে কিছু কিছু ব্লগার। আর এই দিকে ইনভেষ্টমেন্টের চিন্তাও অনেকের আছে।  এই দিক থেকে কোন ব্লগার যদি নিজেকে অনলাইন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তাহলে অনেক বেশি সুবিধা তৈরী হতে পারে।

ব্লগিং এবং সাংবাদিকতা এক জিনিস নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে সংবাদের মতো ব্লগ লেখায় অভ্যস্ত অনেক ব্লগার একজন ভাল সাংবাদিক হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমি কিছু দিন প্রযুক্তি খবর লিখেছিলাম এবং বেশ কিছু খবরের সাইটে তাদের লেখাগুলো পড়ে সত্যিকার সাংবাদিকতার বেশ কিছু বিষয় মনে এসেছে, যা হয়তো ব্লগারদের অনেকের মধ্যে থাকে না। নিচে বেশ কিছু বিষয় আলোচনা করা হলোঃ

১. শুরু করাঃ

ব্লগের প্রথমে অনেকে এমনভাবে শুরু করেন-" গতকাল দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম কিছু লোকের ভীর। পরে নিচে নেমে দেখতে পেলাম..." কিন্তু সংবাদ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে একটু বেশি একটিভ থাকতে হয়। প্রথম পাতায় সংবাদের মৌলিক একটা অংশ প্রকাশ করতে হবে - এই চিন্তা মাথায় রেখে শুরু করতে হবে। পাঠককে এমন এক জায়গায় প্রথম পাতার লেখাটি শেষ করতে হবে যাতে পাঠক পত্রিকার পাতা/ ওয়েবসাইটে বাকি অংশ পড়তে আগ্রহী হয়। সুচনাটিকে একই সাথে হৃদয়গ্রাহী ও অর্থবোধকতা রাখতে হবে।

২. কন্ঠস্বরঃ

মূল ঘটনাটি আসলে কি তা স্পষ্ট ভাষায় লিখে যেতে হবে। অনলাইনে খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে কন্ঠস্বরের স্পষ্টতা অনেক সময় খবরটি সম্পর্কে পাঠকের বিশ্বাস জন্ম নিতে পারে। ঘটনাটি আসলে ঘটেছে তা স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করতে হবে, মূল ঘটনাটিকে কোন কারনে হাত ছাড়া করা যাবে না।

৩. পক্ষপাতিত্বঃ

অধিকাংশ ব্লগারই নিরপেক্ষ দৃষ্টি থেকে কথা বলার ক্ষমতা রাখে না। দলীয় বা ধর্মীয় বেপারে অনেক সময় কোন একপক্ষের উপর আবেগাত্বক আক্রমণ করা ব্লগ ও তার মন্তব্যগুলোতে অহরহ দেখা যায়। কিন্তু অনলাইনে আপনি সংবাদ লিখতে হলে এগিয়ে যেতে হবে ভিন্ন পথে, জেনে নিতে হবে যে ভিন্ন ভিন্ন দল, মত ও বিশ্বাসের লোকের উপর আঘাত করার চেষ্টা কোন সংবাদকে অতিরঞ্জিত করা যাবে না।

৪. বানান, ব্যকরণ ও শব্দ সচেতনতাঃ

ব্লগারদের শব্দ সচেনতার উপরে কয়েকদিন আগেই কথা বলেছিলাম। সেখানে মূলতঃ আঞ্চলিকতা, অভ্যাসগত বাজে শব্দ ও বিদেশিভাষার মিশ্রনের বেপারে বলেছিলাম। সেই বিষয় ছাড়াও ভাষার সুমিষ্টতা, ব্যকরণের নিয়ম ও বানানের বেপারেও শক্ত হতে হবে। অধিকাংশ অনলাইন সাংবাদিকগণ সরাসরি তাদের আইডি থেকে সংবাদ প্রকাশ করেন আর তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত ব্লগে ভুরি ভুরি বানান ভুল থাকলেও অনেকে কথা বলে না। কিন্তু ভাল একটি সংবাদ মাধ্যমে তা করতে গেলে সমালোচনার পাত্র হতে হবে।

৫. সত্যতা যাচাইঃ

সঠিক খবরটি প্রকাশ করতে হবে। অবিশ্বস্ত সূত্র থেকে খবরটি পেয়ে সাথে সাথে প্রকাশ করা যাবে না। ওয়েবে অনেক ধরনের খবরই ছাপা হতে পারে। এখানে আবার অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়াতে পারে। আর তাকেই সত্যকারের খবর ভেবে ছাপিয়ে দেওয়াটা বোকামী।

৬. মৌলিকত্বঃ

খবরটি নিজস্বতার ভিত্তিতে প্রকাশ করার প্রতি খেয়ালরাখা দরকার। পথে পথে ঘুরে সংবাদকর্মী যে তথ্য পাবে তা কখনো ঘরে বসে আপনি জানতে পারবেন না। খবরের অন্তরালের অনেক কিছুই প্রকাশ হয় না। তবে তা জানা বিশেষ প্রয়োজনীয়। খবরটির মৌলিকত্বের জন্য কখনো কখনো স্বাক্ষাতকারের আয়োজন করা যেতে পারে, কারোকোন উক্তি প্রকাশ করা যেতে পারে।

আর নিজের মতাদর্শকে এমনভাবে প্রকাশ করতে হবে যাতে সেটা বুঝা যায়, সেটা যে আদর্শ নয়-আলোচনা মত্র তা অবশ্যই প্রকাশ ভঙ্গিতে বুঝতে পারতে হবে।

আশা করা যায় ব্লগারদের মাঝে অনেকেই সাপ্রতিক ভবিষ্যতে ভাল রিপোর্টার হতে পারবেন, সেটা কোন ভাল পত্রিকাও হতে পারে বা নিজের একটি খবরের সাইটও হতে পারে।

3 thoughts on “অনলাইন সাংবাদিকতাঃ ব্লগারদের পথ হতে পারে”

  1. লেখাটা সম্পর্কে কি মন্তব্য করবো ঠিক বুঝে ওঠতে পারছি না। তবে আমার মনে হয় আজ থেকে ৩০ বছর পর আর কাগজের পত্রিকা থাকবে না। তখন সব হবে অনলাইনেই। আর পত্রিকা গুলোর মূল হয় হবে বিজ্ঞাপন, বিক্রি নয়।

    1. @শিবলী, হা সেই দিন খুব দূরে না, তবে বাংলাদেশের অর্থ সামাজিক অবস্থার উপরে বিষয়টি নির্ভর করে। তার পরেও কাগজের পত্রিকা থাকবে বলেই মনে হয়।
      অনরাইন সাংবাদিকতার উজ্জল ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখনই মাঠে নামার উপযুক্ত সময়।

Leave a Comment