গৃহশিক্ষক, কোচিংসেন্টার আর স্কুলের পড়ার চাপে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথ অবরুদ্ধ

আজ-কাল প্রায় সব শিক্ষার্থীদেরকেই স্কুলের পাশাপাশি পড়ালেখাকে সহজবোধ্য করতে গৃহ শিক্ষক বা কোচিং সেন্টার অথবা ব্যাচ সিস্টেমে কোন স্যারের সহায়তা নিতে হচ্ছে। মূলত: নিজের সন্তানদের মেধা বিকাশের এসবকেই সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অবিভাবকগণ ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্য স্কুলের পরেই এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠায়। এ ব্যাপারে আজ আমার আলোচনা।

বিদ্যালয়ের পরে গৃহশিক্ষক বা কোচিংসেন্টারের প্রয়োজন কেন?

একজন শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের জন্য বিদ্যালয়ে ছয় ঘন্টা (উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ) পড়ালেখা করার পরও গৃহশিক্ষক বা কোচিংসেন্টারের প্রয়োজনকে অনেকে তুচ্ছ ভাবতে পারে না একারনে যে-

  • ১. বিদ্যালয়ে ৪০-১০০ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে থেকে পড়ালেখা করলে অনেক কিছুই বুঝে ওঠতে পারে না ।
  • ২. অনেকের মধ্যে পাঠদানের কারনে শিক্ষার্থী শিক্ষককে অনেক প্রশ্নই করতে পারে না এই ভেবে -অন্যের কাছে সে ছোট হবে বা তার প্রশ্ন শুনে অন্য শিক্ষার্থীরা হাসতে পারে বা শিক্ষকও বিরক্ত হতে পারে।
  • ৩. বিভিন্ন কারনে (ছুটি ছাড়াও) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, শিক্ষকের/ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি বা শিক্ষক/শিক্ষার্থীর অমনোযোগি হওয়ার কারনে অনেক সময়ই সুনির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ করা হয় না।
  • ৪. সবার মধ্যে একটি ধারনা বদ্ধমূল হয়েগেছে যে যত বেশি গৃহশিক্ষক (বা বিষয় ভিত্তক গৃহশিক্ষক) বা কোচিং সেন্টারে (বা ভালো কোচিং সেন্টারে) পড়ানো যায় ততই মঙ্গল।

কিছুদিন আগের একটা অভিজ্ঞতা থেকে

কয়েকদিন আগে ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া আমার ভাগিনার দৈনন্দিন সময়সূচি দেখে আমি অনেকটা হতবাক।
সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হয় কোচিঙের উদ্দেশ্যে যায়। ৮:৩০ থেকে ১১:৪৫ পর্যন্ত পড়তে হয় সেখানে । ১২ টায় স্কুল, ৪টা পর্যন্ত চলে: বাসায় আসতে আসতে বিকেল ৪.৩০ টা বেজে যায়। সন্ধার পর একে একে ২ জন হাউজ টিউটর আসে। ১০ টায় খাওয়া দাওয়া ১১ টায় ঘুম। মোটেও খেলাধুলা করে না। বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ -বড়জোর ছাদে ওঠার অনুমুতি আছে ওর।
এবার আসা যাক পড়ালেখার অবস্থা সম্পর্কে, আমি ওর স্কুল, কোচিং আর বাসার স্যারের খাতাগুলো দেখতে চাইলাম। রাফ খাতাগুলো একটু হাতিয়ে দেখলাম। একই অংক স্কুলের স্যার করে দিয়েছেন, বাসার গনিত স্যার করে দিয়েছেন, কোচিঙের স্যারও করে দিয়েছেন। সামান্য তফাৎ নিয়মে। যে অংকটি তিন স্যার তিনবার করে দিয়েছেন সেই অংকটি কসতে বললাম। কিছুক্ষন এতদিক সেদিক করে পরে বলল, সে এই অংকটি পারে না। আমি নমনিয় ভাবেই বললাম-যে অংকটি তিন স্যার তিনবার করে দিয়েছে তা তুমি কি একবারও বাসায় প্র্যাকটিস করেছ? ও বলল, সময় পাই নি মামা। প্রকৃত পক্ষেই সে সময় পায় নি।
আসলে ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে আমরা কতই অবহেলা করি যে, তাদেরকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই যে সে শিক্ষিত হচ্ছে। আমি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কোচিং বা বাসার স্যারকে দোষারোপ করছি না। আসলে ক্লাস সিক্সের গনিত বিষয়ে যে ছেলেটা স্কুলে ৪৫ মিনিট, কোচিঙে ৫০ মিনিট আর বাসার স্যারের কাছে ৬০ মিনিট সময় দিচ্ছে তারতো অঙ্কে জাহাজ হওয়ার কথা ।
এক এক জনের শিক্ষাদান পদ্ধতি এক এক ধরনের। আর একই বিষয়ে সব পদ্ধতি একজনের উপর প্রদান করলে প্রকৃত বিষয়টি না শিখে এত মত পার্থক্য দেখে বিষয়টিকে শিক্ষার্থীর কাছে বিষের মতো মনে হতে পারে।

তাই শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীর সকল সময় খেয়ে ফেললে হবে না । শিক্ষার্থীদেরও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার জন্য সময় দিতে হবে। আমি মনে করি এ ব্যাপারে অবিভাবকদের যথেষ্ঠ সচেতন হওয়া দরকার।

Leave a Comment